দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে যাত্রা শুরু করেছে কলকাতা ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো। আর এই মেট্রোর উদ্বোধনের আগেই হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। উদ্বোধনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণ না করায় বেজায় চটেছে তৃণমূল। অন্যদিকে বিজেপি-সিপিএম বলছে, এটা মমতার কাজের ফল। তাঁর সরকার আগে যেমন করেছে, তারই জবাব দেওয়া হচ্ছে। এই বিষয়ে অবশেষে মুখ খুললেন মমতা। বললেন, এই কাজের সবটাই তিনি কষ্ট করে করেছেন। অথচ তাঁকেই আমন্ত্রণ করা হল না। এতে তিনি খুব দুঃখ পেয়েছেন।

শুক্রবার সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই ব্যাপারে মুখ খোলেন মমতা। তিনি বলেন, “এই মেট্রো রেলের কাজ কত কষ্ট করে করেছি। এই কাজ করতে গিয়ে চোখের জল পর্যন্ত পড়েছে। আর আজ সব কিছু করে দেওয়ার পর উদ্বোধনের আগে একবার জানানোর প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করল না। খুব দুঃখ লাগে। অবশ্য এটা ওদের ব্যাপার। আমি কী করেছি তা সবাই জানে।”

তৃণমূলের তরফে এই ঘটনার তীব্র নিন্দে করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন পেয়েও যাননি রাজ্যের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত দমকল এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের মন্ত্রী সুজিত বসু, সাংসদ কাকলী ঘোষদস্তিদার ও বিধাননগর পুরসভার মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তী। দলের কিছু নেতার কথায়, এভাবে মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্য সরকারকে বাইরে রেখে কোনও প্রকল্প উদ্বোধন কেন্দ্র করতে পারে না। এটা তীব্র অসৌজন্যতার নিদর্শন। অবশ্য উদ্বোধন করতে এসে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।

এই ঘটনার জন্য অবশ্য মমতা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিকেই দায়ী করেছে সিপিএম ও বিজেপি। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বাম পরিষদীয় নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, “২০০৯ সালে আজকের মুখ্যমন্ত্রী যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন বাংলায় একাধিক প্রকল্পের ফিতে কেটেছিলেন। একটা অনুষ্ঠানেও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন? সেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে অন্যায় করেছিলেন, আজ বিজেপি তাঁর বিরুদ্ধে একই কাজ করছে।” প্রাক্তন সাংসদ মহম্মদ সেলিম বলেছেন, “একটা সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই দত্তবাদে লোক ক্ষেপিয়ে মেট্রোর জন্য জমি অধিগ্রহণ আটকে দিয়েছিলেন। বউ বাজারে ব্যবসায়ীদের ক্ষেপিয়ে রাস্তায় নামিয়েছিলেন মেট্রোর কাজ আটকাতে। কৃতিত্ব নিজের নামে চালাতে গিয়েছিলেন। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।”

অন্যদিকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেন, “কেন্দ্রের টাকায় তৈরি অনেক প্রকল্পের উদ্বোধনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একা একা করে দেন। এবার রেল যেটা করেছে সেটা মমতার প্রাপ্য ছিল।”

মমতার এদিনের কথার পর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের বক্তব্য, ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের শিলান্যাস কিন্তু হয়েছিল বাম আমলে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রমুখ এই প্রকল্পের শিলান্যাস করেন। প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছিল বাম জমানাতেই। রাজ্যের দেওয়া পরিকল্পনা কেন্দ্রের নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের অনুমোদন পেয়েছিল। পরে ইউপিএ-১ সরকারের সময় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রকল্পকে রেলমন্ত্রকের অধীনে আনার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ তিনিই সব করেছেন বলে যে দাবি মমতা করছেন, তা ঠিক নয়। দক্ষিণেশ্বর, জোকা প্রভৃতি মেট্রো সম্প্রসারণ তিনি করলেও ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো কিন্তু শুরু হয়েছিল বাম আমলেই। আর গতকালের উদ্বোধন নিয়ে যা হয়েছে, সে পথও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই দেখিয়েছেন বলে মত তাঁদের।